বিশ্বের এক কোণে হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত ছোট্ট দেশ ভুটান আধুনিক বিশ্বের এক বিস্ময়। যেখানে উন্নয়নের মাপকাঠি কেবল জিডিপি নয়, বরং জাতীয় সুখ- এমন দেশ আর কোথাও নেই। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, অনন্য সংস্কৃতি, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং মানবকল্যাণে গৃহীত নীতিমালার কারণে ভুটান আজ গোটা বিশ্বে প্রশংসিত।
সুখই প্রধান লক্ষ্য
ভুটান এমন এক দেশ, যেখানে মানুষের সুখই রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য। ২০০৮ সালে দেশটিতে ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস কমিটি’ গঠন করা হয়, যা জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম মানদণ্ড। পৃথিবীর একমাত্র দেশ হিসেবে ভুটানের রয়েছে ‘মিনিস্ট্রি অব হ্যাপিনেস’ বা সুখ মন্ত্রণালয়। এখানকার জনগণ কতটা সুখী, তার ভিত্তিতেই সরকার নীতিমালা তৈরি করে। ২০১৮ সালে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ৯১% ভুটানি নাগরিক নিজেদের সুখী বলে মনে করেন।
সবার জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা ও সামাজিক নিরাপত্তা
ভুটানে সরকারি উদ্যোগে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় দেশের সকল নাগরিক উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পায়। এখানে কোনো গৃহহীন বা ভিক্ষুক নেই, যা সামাজিক নিরাপত্তার এক অনন্য নজির।
পরিবেশ সংরক্ষণে অগ্রগণ্য
ভুটান পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যা ‘কার্বন নেগেটিভ’। অর্থাৎ, তারা যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করে তার চেয়ে বেশি অক্সিজেন উৎপাদন করে। দেশটির সংবিধান অনুযায়ী, ভূমির কমপক্ষে ৬০ ভাগ বনভূমি হিসেবে সংরক্ষিত রাখতে হবে। বর্তমানে দেশটিতে বনভূমির পরিমাণ ৭১ ভাগ। ২০১৫ সালে ভুটানের নাগরিকরা মাত্র এক ঘণ্টায় ৫০ হাজার গাছ রোপণ করে বিশ্বরেকর্ড গড়ে।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণ
ভুটানের রাজা তাদের সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত সেখানে টেলিভিশন ও ইন্টারনেট নিষিদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে প্রযুক্তির প্রসারে এ সিদ্ধান্ত বদল করা হয়, তবে এখনো ভুটানের ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
তামাক ও প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে কঠোর আইন
ভুটানে সিগারেট ও অন্যান্য তামাকজাত পণ্য নিষিদ্ধ। যদি কোনো পর্যটক দেশে তামাক জাতীয় পণ্য নিয়ে প্রবেশ করতে চান, তবে তাকে উচ্চ কর পরিশোধ করতে হয়। লুকিয়ে আনলে কড়া শাস্তির বিধান রয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ বিমানবন্দর
ভুটানের পারো বিমানবন্দর বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক বিমানবন্দর। এখানে বিমান অবতরণ করতে হলে পাইলটদের বিশেষ প্রশিক্ষণ নিতে হয়। বর্তমানে মাত্র ৮ জন পাইলট পারো বিমানবন্দরে বিমান অবতরণের অনুমতি পান।
পর্যটনে সীমাবদ্ধতা
ভুটান সরকার পর্যটনের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ রেখেছে। এখানে ভ্রমণ ব্যয়সাপেক্ষ এবং কঠিন করা হয়েছে, যাতে দেশের সংস্কৃতি ও পরিবেশ ক্ষতির মুখে না পড়ে। পর্যটকদের দৈনিক নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়, যা সরকার দেশ উন্নয়নে ব্যবহার করে।
একটি সত্যিকারের বিস্ময়কর দেশ
ভুটান কেবল একটি দেশ নয়, এটি এক দর্শন। যেখানে অর্থের চেয়ে মানবকল্যাণ ও প্রকৃতির সুরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সুখী মানুষের দেশ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা, পরিবেশ সংরক্ষণে কঠোর নীতি, এবং উন্নয়ন ও ঐতিহ্যের ভারসাম্য বজায় রাখার অসাধারণ দৃষ্টান্ত বিশ্বের অন্য দেশগুলোর জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।
ভুটানে অল্প খরচে বেস্ট হোটেল বুকিং করতে এখানে ক্লিক করুন: Booking.com