গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (DRC) বিশ্বের অন্যতম খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ দেশ। দেশটির মাটির নিচে লুকিয়ে আছে প্রায় ২৪ ট্রিলিয়ন ডলারের খনিজ সম্পদ- যার মধ্যে রয়েছে কোবাল্ট, লিথিয়াম, তামা, হীরা, সোনা, ইউরেনিয়াম, কোলটানসহ আরও বহু মূল্যবান খনিজ। এই সম্পদের পরিমাণ সৌদি আরব বা কাতারের তেলের রিজার্ভের চেয়েও বেশি। তবে, এই বিপুল সম্পদের মালিক হয়েও কঙ্গো আজ বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোর একটি।
কঙ্গোর বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ৯ কোটি। যদি ২৪ ট্রিলিয়ন ডলার সমভাবে বণ্টন করা হতো, তবে প্রতিজন নাগরিক পেতেন প্রায় ২ কোটি ২৭ লাখ টাকা। কিন্তু বাস্তবে, দেশটির মাথাপিছু আয় মাত্র সাড়ে পাঁচশ মার্কিন ডলার। ৭৩.৫% মানুষ প্রতিদিন ২.১৫ ডলারেরও কম আয় করেন, যা আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে।
ইতিহাসের শেকড়: উপনিবেশ ও শোষণ
১৬শ শতকে ইউরোপীয়দের আগমন ঘটে কঙ্গোতে। শুরু হয় দাস ব্যবসা। ১৮৭৯ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত কঙ্গো ছিল বেলজিয়ামের উপনিবেশ। এই সময়ে কঙ্গোর জনগণের উপর ব্যাপক অত্যাচার চালানো হয় এবং বিপুল পরিমাণ খনিজ সম্পদ লুটপাট করা হয়। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে ফেলা পারমাণবিক বোমার ইউরেনিয়ামও সংগ্রহ করা হয়েছিল কঙ্গো থেকেই।
১৯৬০ সালে কঙ্গো স্বাধীনতা লাভ করে। তবে, স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে দেশটির ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয় ৮৫ হাজার কোটি টাকার মিথ্যা ঋণের বোঝা। এই ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে দেশের অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।
কঙ্গোর খনিজ সম্পদ থেকে সাধারণ মানুষের প্রাপ্তি প্রায় শূন্য। বিদেশি কোম্পানিগুলো ঘুষের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে খনিজ উত্তোলন করছে। ২০২২ সালে, কঙ্গোর খনিজ রাজস্বের ৭৫০ মিলিয়ন ডলার সরকারি কোষাগারে জমা না পড়ে নিখোঁজ হয়ে যায়।
কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে ১২০টিরও বেশি সশস্ত্র গোষ্ঠী খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাতে লিপ্ত। এই সংঘাতে ৬ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
কঙ্গোর খনিজ সম্পদের প্রতি আন্তর্জাতিক আগ্রহ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, এবং অন্যান্য দেশগুলো কঙ্গোর খনিজ সম্পদে বিনিয়োগ করছে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক KoBold Metals কঙ্গোর Manono লিথিয়াম প্রকল্পে ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে।
সমাধানের পথ
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা: সরকারি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ: খনিজ সম্পদের বণ্টনে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ: মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
কঙ্গো একটি বৈপরীত্যের দেশ- অসীম সম্পদের অধিকারী, কিন্তু চরম দারিদ্র্যে নিমজ্জিত। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, এবং জনগণের সচেতনতা। যতদিন দুর্নীতি ও শোষণ চলবে, ততদিন কঙ্গোর জনগণের মুক্তি অসম্ভব।