এশিয়া পৃথিবীর বৃহত্তম এবং সবচেয়ে জনবহুল মহাদেশ। বিশাল এ ভূখণ্ডের বিস্তৃতি বিষুবরেখা থেকে শুরু করে মেরু বৃত্তকেও ছাড়িয়ে গেছে। বছরের ৬ মাস জুড়ে শীতকাল গ্রাস করে মহাদেশটির উত্তর অংশ। রাশিয়ার উত্তরাঞ্চলের প্রায় ৫০ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার ভূমী ঢাকা পড়ে বরফের শুভ্র চাঁদরে। এ অঞ্চলে তাপমাত্রা নেমে যেতে পারে মাইনাস ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এ ধরণের পরিবেশে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব।
আর্কটিক রাশিয়া থেকে অনেক দূরে এশিয়ার রয়েছে সবচেয়ে উষ্ণ মরুভূমি, সর্বোচ্চ পর্বত আর দীর্ঘতম বনাঞ্চল। যা মহাদেশটিকে সবচেয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ মহাদেশে পরিণত করেছে। কিন্তু, মহাদেশটি সবসময় এতোটা বৈচিত্র্যপূর্ণ ছিল না।
ভূতাত্ত্বিক গঠন ও হিমালয়ের সৃষ্টি
প্রায় ৯ কোটি বছর আগে, ভারতীয় উপমহাদেশ ছিল একটি দ্বীপ, যার অবস্থান ছিল এশিয়ার দক্ষিণে, মূল ভূখণ্ড থেকে অনেক দূরে। কালের বিবর্তনে এটি উত্তর দিকে ধাবিত হয়েছে, চাপ সৃষ্টি হয়েছে এশিয়া এবং উপমহাদেশের মধ্যবর্তী মাটির স্তরে। কোটি কোটি বছরের সঙ্কোচনে মধ্যবর্তী স্তর আকাশপানে ধাবিত হয়েছে, সৃষ্টি হয়েছে হিমালয় পর্বতমালা। বর্তমানে, পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতগুলোর অবস্থান এখানেই। কোন কোনটির উচ্চতা সাড়ে আট হাজার মিটারেরও বেশি। ভারতীয় উপমহাদেশ এখনো উত্তর দিকে দিকে ধাবিত হচ্ছে এবং উচ্চতা বাড়ছে পর্বতগুলোর। হিমালয় পর্বতমালার ব্যাপ্তি আফগানিস্তান থেকে শুরু করে সুদূর চীনের মধ্যাঞ্চল পর্যন্ত।
হিমালয় পর্বতের পশ্চিমে পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণ মরুভূমির অবস্থান। ইরানের লুট মরুভূমিতে তাপমাত্রা ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছায়। এখানকার আবহাওয়া এতোই কঠিন যে, এখন পর্যন্ত মাত্র একটি অভিযাত্রী দল মরুভূমিটি পায়ে হেঁটে পার হতে সক্ষম হয়েছে।
হিমালয় এশিয়ায় মূলত একটি দৈত্যাকার দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা মহাসাগর থেকে উত্থিত মেঘমালাকে উত্তরে প্রবাহিত হতে বাধা দান করছে। ফলে, দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গড়ে উঠেছে এক নতুন ধরণের জলবায়ু। মৌসুমি বা ঋতু ভিত্তিক জলবায়ু। যেখানে বর্ষাকাল সবচেয়ে প্রভাবশালী ঋতু। বর্ষাকালের ভারি বর্ষণ, এ অঞ্চলকে জীবজগতের স্বর্গে পরিণত করেছে। গড়ে উঠেছে ঘন রেইনফরেস্ট, যেখানে প্রায় সব রকমের গাছ-গাছালি এবং প্রাণীরা সমৃদ্ধি লাভ করেছে।
সমুদ্র ও নদীর অবস্থা
এশিয়া সংলগ্ন সাগর এবং নদীসমূহ পৃথিবীর সবচেয়ে উর্বর জলাভূমি। পৃথিবীর কয়েকশো কোটি মানুষ খাদ্য এবং জীবীকার জন্য প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে এসব সাগরের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু, পরিস্থিতি এখন খুব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
এশিয়ার জনসংখ্যা বর্তমানে ৪৬০ কোটিতে পৌঁছেছে। ফলে, পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মহাদেশটিও বন্যপ্রাণীদের জায়গা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান নগরায়ন কেড়ে নিচ্ছে বন্যপ্রাণীদের আবাসভূমি। মাত্রাতিরিক্ত মৎস্য শিকার এবং দূষণে সাগর ও নদীগুলো জীবন শূন্য হয়ে পড়ছে।
এশিয়ার রাজকীয় প্রাণী রয়েল বেঙ্গল টাইগার, সুমাত্রান গণ্ডার, ওরাংওটান, সুমাত্রান টাইগারসহ অসংখ্য প্রাণী বর্তমানে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে।
নতুন সভ্যতার করাল গ্রাস যে শুধু জীবজগতকেই গ্রাস করছে, তা নয়। প্রকৃতির ভারসাম্যও চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। ক্রমাগত গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, হিমবাহের গলন, অনিয়মিত মৌসুমি বৃষ্টি ও হঠাৎ করে দেখা দেওয়া ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ আজ মহাদেশজুড়ে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।
হিমালয়ের হিমবাহগুলো বহু নদীর উৎসস্থল। গঙ্গা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, সিন্ধু, মেকং, ইয়াংজে—এসব মহানদী কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার উৎস। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে, নদীগুলো হারাচ্ছে তাদের প্রাকৃতিক ভারসাম্য। শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব, বর্ষাকালে ভয়াবহ বন্যা—দুইই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে কৃষি, জনজীবন ও সম্পূর্ণ ইকোসিস্টেমকে।
প্রকৃতি তার প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করেছে। মেঘে-মেঘে বৃষ্টি কমে যাচ্ছে, আবার হঠাৎ অতিবৃষ্টিতে ধসে পড়ছে পাহাড়, প্লাবিত হচ্ছে জনপদ। সাগরের জলস্তর বাড়ছে, উপকূলীয় অঞ্চলগুলো ধীরে ধীরে বিলীন হচ্ছে সাগরের পেটে। আর এসবের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে হাজার বছরের পুরোনো গ্রাম, সংস্কৃতি, ভাষা ও জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার।
এশিয়ার সামগ্রিক সংকটের উৎস শুধুই জনসংখ্যা নয়—বরং আমাদের চাহিদা, লোভ, এবং প্রকৃতির প্রতি অশ্রদ্ধাই এর মূল চালিকা শক্তি। বন কেটে গড়ে উঠছে শহর, শিল্প, এবং নতুন নতুন অবকাঠামো। প্রতিটি গাছের মৃত্যু মানে একটি বাস্তুসংস্থানের মৃত্যু, একেকটি প্রাণীর বিলুপ্তি মানে খাদ্য শৃঙ্খলের দুর্বলতা।
তবে এখনও সব শেষ হয়ে যায়নি। এই মহাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমাদের বর্তমান সিদ্ধান্তের উপর। প্রকৃতির সঙ্গে পুনরায় বন্ধুত্ব গড়া, পরিবেশ সংরক্ষণে সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ, টেকসই জীবনযাপন গ্রহণ করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক বাসযোগ্য এশিয়া গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে জরুরি দায়িত্ব।
এশিয়া এক সময় জন্ম দিয়েছিল সবচেয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রাকৃতিক দৃশ্য, বিস্ময়কর ভূগঠন ও জীববৈচিত্র্যের। এখন সেই এশিয়াকে বাঁচানোর পালা। হিমালয় এখনো আকাশ ছুঁতে চায়, বন এখনো প্রাণ ফিরে পেতে চায়, নদী এখনো সুরে বয়ে যেতে চায়।
যে হিমালয়ের কল্যাণে দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জীবজগতের এক স্বর্গে পরিণত হয়েছে, সে হিমালয় এখনো উত্থিত হচ্ছে। কিন্তু, হিমালয় সৃষ্ট স্বর্গটি হারিয়ে যাচ্ছে এক মহাশক্তির দাপটে, সভ্যতার করাল গ্রাসে।