বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি: বাস্তবতা ও প্রস্তুতি

বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি

ভূমিকম্প এমন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যার সঠিক পূর্বাভাস বর্তমান প্রযুক্তি দিয়েও নির্ভরযোগ্যভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোও এই দুর্যোগের সামনে অসহায়। সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্ক, সিরিয়া, মিয়ানমারে ভূমিকম্পে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ও অবকাঠামোর ধ্বংস আমাদেরকে এ বিষয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।

বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশ তিনটি প্রধান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত: ইন্ডিয়ান প্লেট, ইউরেশিয়ান প্লেট এবং বার্মিজ প্লেট। ইন্ডিয়ান প্লেট উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে ইউরেশিয়ান প্লেটের সঙ্গে সংঘর্ষে হিমালয় পর্বতমালার সৃষ্টি করেছে, যা এখনও উত্থিত হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় ভূগর্ভে সক্রিয় ফাটল তৈরি হয়েছে, যার মধ্যে মধুপুর ফল্ট এবং ডাউকি ফল্ট উল্লেখযোগ্য। মধুপুর ফল্ট বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে অবস্থিত, যা শক্তিশালী ভূমিকম্পের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। ডাউকি ফল্ট ভারতের উত্তর-পূর্ব অংশ থেকে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত, যা ভূমিকম্পের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত।

ইতিহাসের আলোকে ভূমিকম্পের ঘটনা

বাংলাদেশে অতীতে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী ভূমিকম্প ঘটেছে। ১৮৯৭ সালের ৮.৭ মাত্রার গ্রেট ইন্ডিয়ান ভূমিকম্প সিলেট ও আসাম অঞ্চলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। ১৯১৮ সালের ৭.৬ মাত্রার শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প এবং ১৯৫০ সালের ৮.৬ মাত্রার আসাম ভূমিকম্পও বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক সময়ে, ২০১৫ সালে নেপালে সংঘটিত ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্প বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুভূত হয়, যদিও তা থেকে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়নি।

বর্তমান ঝুঁকি ও গবেষণালব্ধ তথ্য

২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক তাদের গবেষণায় জানান, বাংলাদেশ ও ভারতের পূর্বাঞ্চল এবং মিয়ানমারের কিছু অংশে প্রচণ্ড শক্তিশালী একটি ভূমিকম্প হতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলটির বিস্তার প্রায় ২৪ হাজার বর্গকিলোমিটার, যেখানে প্রায় ১৪ কোটি মানুষের জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাদের মতে, এই অঞ্চলে রিখটার স্কেলে ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প ঘটতে পারে।

ঢাকার ভূমিকম্প ঝুঁকি ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা

ঢাকা মহানগরী বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল অবকাঠামো এবং নির্মাণের অনিয়মের কারণে মাত্র ৬.০ মাত্রার ভূমিকম্পেই শহরের প্রায় ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, ঢাকার ৯০ শতাংশের বেশি ভবন ভূমিকম্প-প্রতিরোধী নয়।

প্রস্তুতি ও করণীয়

ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি:

  • ভবন নির্মাণে সঠিক নীতিমালা অনুসরণ: বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC) অনুযায়ী ভূমিকম্প-প্রতিরোধী ভবন নির্মাণ নিশ্চিত করা।
  • ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংস্কার: পুরোনো ও দুর্বল ভবনগুলোর সঠিক মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও শক্তিশালীকরণ করা।
  • সচেতনতা বৃদ্ধি ও মহড়া: ভূমিকম্পের সময় করণীয় সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা এবং নিয়মিত মহড়া আয়োজন করা।
  • জরুরি সেবা ও সরঞ্জামের প্রস্তুতি: ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জাম সংরক্ষণ করা।

ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে পূর্বপ্রস্তুতি ও সচেতনতার বিকল্প নেই। সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে আমরা আমাদের জনগণ ও সম্পদকে সুরক্ষা দিতে সক্ষম হবো।

Facebook
Twitter
WhatsApp
LinkedIn
Email

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার অন্তর্গত সোনাদিয়া দ্বীপ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় প্রতিবেশ ব্যবস্থা। প্রায় ৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপে রয়েছে ম্যানগ্রোভ বন, বালিয়াড়ি, লবণাক্ত জলাভূমি, কাদাময় চর এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। কিন্তু গত এক দশকে অবৈধভাবে চিংড়ি ঘের সম্প্রসারণের কারণে দ্বীপটির প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বন দ্রুত ধ্বংস হচ্ছে। স্থানীয় পরিবেশবিদদের মতে, এই […]

মাত্র ২০ হাজার বছর আগে, সারা পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা ছিল ১০ লাখেরও কম। তারা বেঁচে ছিল প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে- শিকার, ফল-মূল, নদী, জঙ্গল ছিল তাদের জীবনধারার উৎস। তখনকার জীবন ছিল প্রকৃতির সাথে একধরনের ভারসাম্যে বাঁধা। কিন্তু সেই জীবন ছিল কঠিন এবং অনিশ্চয়তায় ভরা। মানুষের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল তার বুদ্ধিমত্তা। আর এই বুদ্ধিই ধীরে […]

প্রকৃতির মাঝে লুকিয়ে আছে অসংখ্য বিস্ময়কর ঘটনা, যেগুলো আমাদের মুগ্ধ করে রাখে। বায়ুমণ্ডলে সূর্যের আলো ও বরফ কণার সংমিশ্রণে সৃষ্টি হয় কিছু চমকপ্রদ আলোকপ্রভাব, যা সচরাচর দেখা যায় না। এই ধরনের কিছু অসাধারণ বায়ুমণ্ডলীয় ঘটনার মধ্যে পারহেলিয়া (Parhelia), সার্কাম হরাইজন আর্ক (Circumhorizon Arc), সান পিলার (Light Pillar) এবং সূর্য বলয় (Sun Haloes) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চলুন, […]

মানব সভ্যতা হাজার বছর ধরে নানা প্রতিকূলতা জয় করে এগিয়ে এসেছে। কিন্তু ভবিষ্যতে কি আমরা টিকে থাকতে পারবো? বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এমন কিছু ঝুঁকি রয়েছে যা পুরো মানবজাতিকে বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিতে পারে। এই ঝুঁকিগুলো শুধুমাত্র কাল্পনিক বিজ্ঞান কল্পকাহিনির বিষয় নয়—এগুলোর বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। আমাদের নিজেদের কর্মকাণ্ড এবং প্রকৃতির ভয়াবহ শক্তি একত্রিত হয়ে যদি অনিয়ন্ত্রিত […]

আগ্নেয়গিরি ভূ-পৃষ্ঠের এমন একটি গঠন, যেখানে ভূগর্ভস্থ গলিত শিলা (ম্যাগমা), গ্যাস এবং অন্যান্য উপাদান বিস্ফোরণের মাধ্যমে বা ধীরে ধীরে নির্গত হয়। যখন এই ম্যাগমা ভূ-পৃষ্ঠে উঠে আসে, তখন তাকে লাভা বলা হয়। লাভা ঠান্ডা হয়ে শক্ত হয়ে গেলে আগ্নেয়গিরির আকৃতি তৈরি হয়। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত- পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ভৌগোলিক ঘটনা। এটি এমনি একটি ঘটনা যা বেশ […]

বিশ্বের বৃহত্তম বরফখণ্ড ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত দক্ষিণ জর্জিয়া দ্বীপের অগভীর পানিতে আটকে গেছে। এই দ্বীপটি লক্ষ লক্ষ পেঙ্গুইন ও সিলের আবাসস্থল। দুটি বৃহত্তম লন্ডনের সমান আকারের এই বিশাল বরফখণ্ডটি আটকে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে এবং এটি দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে ভেঙে পড়তে শুরু করবে। স্থানীয় জেলেরা আশঙ্কা করছেন, তারা বিশাল বরফখণ্ডের সঙ্গে লড়াই করতে বাধ্য হবেন এবং […]

জলবায়ু পরিবর্তন (Climate Change) একটি বৈশ্বিক সমস্যা, যা বিশ্বব্যাপী পরিবেশ, প্রকৃতি এবং মানুষের জীবনযাত্রার ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তন মূলত পৃথিবীর সাধারণ তাপমাত্রা বৃদ্ধি, আবহাওয়া ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হার বৃদ্ধি করে চলেছে। এটি এমন একটি সমস্যা যা শুধু একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমস্ত বিশ্বব্যাপী এর প্রভাব পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন কি […]

বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণ করেছেন যে পৃথিবীর চৌম্বকীয় উত্তর মেরু দ্রুতগতিতে রাশিয়ার সাইবেরিয়ার দিকে সরে যাচ্ছে। ব্রিটিশ জিওলজিক্যাল সার্ভে (বিজিএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে এই মেরুর গতি ছিল বছরে প্রায় ১৫ কিলোমিটার, যা বর্তমানে বেড়ে বছরে ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটারে পৌঁছেছে। চৌম্বকীয় উত্তর মেরুর এই দ্রুত স্থানান্তর নেভিগেশন সিস্টেম, বিশেষ করে কম্পাস এবং জিপিএস-এর […]

ঢাকা বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র। শিল্পায়ন, যানজট এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে এ শহরের শব্দদূষণ ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একজন মানুষের সহনশীল শব্দের মাত্রা ৬০ ডেসিবেল। অথচ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় শব্দের মাত্রা ৮৫ থেকে ১০৫ ডেসিবেলের মধ্যে ওঠানামা করে, যা মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ঢাকার শব্দদূষণের প্রধান কারণ: ১. যানবাহনের হর্ন: ঢাকা শহরে […]

বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্প যুগের (১৮৫০-১৯০০) তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করতে পারে। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, যা পরিবেশের উপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণকে দায়ী করা হয়। এছাড়া, প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো পরিস্থিতির কারণে তাপমাত্রা আরও বাড়তে […]