মাত্র ২০ হাজার বছর আগে, সারা পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা ছিল ১০ লাখেরও কম। তারা বেঁচে ছিল প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে- শিকার, ফল-মূল, নদী, জঙ্গল ছিল তাদের জীবনধারার উৎস। তখনকার জীবন ছিল প্রকৃতির সাথে একধরনের ভারসাম্যে বাঁধা। কিন্তু সেই জীবন ছিল কঠিন এবং অনিশ্চয়তায় ভরা।
মানুষের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল তার বুদ্ধিমত্তা। আর এই বুদ্ধিই ধীরে ধীরে বদলে দিয়েছে গোটা পৃথিবীর চেহারা। মানুষ শিখেছে বন্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে, শিখেছে উৎপাদন বাড়াতে, আর সেই দক্ষতা থেকেই জন্ম নিয়েছে কৃষি, শিল্প, নগরায়ন। এর ফলাফল? মানুষের সংখ্যা বেড়ে এখন প্রায় ৮০০ কোটির কাছাকাছি। আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে আমাদের চাহিদা, চাপে পড়েছে পৃথিবীর সব প্রাকৃতিক সম্পদ।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর জনসংখ্যা ২০২২ সালে ৮০০ কোটিতে পৌঁছায়, এবং ২০৫০ সালের মধ্যে তা প্রায় ৯৭০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর চাহিদা মেটাতে পৃথিবী থেকে ইতোমধ্যে কাটা হয়েছে প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন গাছ। ১৯৭০ সালের পর থেকে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা কমেছে ৬০ শতাংশের বেশি। বনভূমি হয়ে উঠেছে দুর্লভ, প্লাস্টিক বর্জ্য আর গ্রিনহাউস গ্যাসে ছেয়ে গেছে নদী, সমুদ্র, আকাশ।
এই বাস্তবতা নিয়ে বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমরা প্রবেশ করেছি এক নতুন ভূতাত্ত্বিক যুগে- অ্যানথ্রোপসিন, বা মানুষের যুগ। এ যুগের বৈশিষ্ট্য হলো, প্রকৃতির ওপর মানুষের চরম কর্তৃত্ব, এবং সেই কর্তৃত্বের ফলাফলস্বরূপ একের পর এক পরিবেশগত বিপর্যয়।
তাহলে কীভাবে ফিরবে ভারসাম্য?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর একটি বড় সমাধান লুকিয়ে আছে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে। কম সন্তান নীতি, সচেতনতা, শিক্ষা এবং নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা গেলে অনেক সমস্যারই সমাধান সম্ভব। ভালো খবর হলো, বর্তমানে অনেক দেশেই জন্মহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে। উন্নত বিশ্বের পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও নতুন দম্পতিরা একটি বা দুটি সন্তানে সন্তুষ্ট থাকছেন। জাতিসংঘের এক পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকেই বিশ্ব জনসংখ্যা স্থিতিশীল হতে শুরু করতে পারে।
তবে শুধু সংখ্যা কমালেই হবে না, প্রয়োজন জীবনযাত্রার ধরন পরিবর্তন। অধিক ভোগ নয়, টেকসই ব্যবস্থাপনা হতে হবে মূলমন্ত্র। এই পরিবর্তন আনার দায়িত্ব বর্তায় আমাদের প্রজন্মের উপর।
মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী- এই বুদ্ধিমত্তা, দায়িত্ববোধ আর ইচ্ছাশক্তির উপরই নির্ভর করছে মানবজাতির ভবিষ্যৎ। আমরা যদি এখনই ভারসাম্যের পথে না ফিরি, তাহলে এই বিলাসবহুল ‘মানব যুগ’ শেষ হতে বেশি সময় লাগবে না।
তবুও আশাবাদী হওয়া যায়, কারণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। এখন সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার- আমরা কি নিজেরা পরিবর্তন হব, নাকি প্রকৃতি আমাদের বদলে দেবে?