বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার অন্তর্গত সোনাদিয়া দ্বীপ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় প্রতিবেশ ব্যবস্থা। প্রায় ৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপে রয়েছে ম্যানগ্রোভ বন, বালিয়াড়ি, লবণাক্ত জলাভূমি, কাদাময় চর এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল।
কিন্তু গত এক দশকে অবৈধভাবে চিংড়ি ঘের সম্প্রসারণের কারণে দ্বীপটির প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বন দ্রুত ধ্বংস হচ্ছে। স্থানীয় পরিবেশবিদদের মতে, এই ধ্বংসযজ্ঞ শুধু গাছ কাটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং পুরো উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক বছর আগেও দ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা ম্যানগ্রোভ বনের বিস্তৃতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু সম্প্রতি বনভূমি পরিষ্কার করে সেখানে বাঁধ নির্মাণ, খাল কেটে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করানো এবং বড় বড় চিংড়ি ঘের তৈরি করা হচ্ছে। বন উজাড়ের কারণে অনেক এলাকায় আর আগের মতো গাছপালা দেখা যায় না।
সোনাদিয়া কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
সোনাদিয়া দ্বীপকে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দ্বীপটিতে রয়েছে প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বন যা পরিযায়ী পাখির বিশ্রামস্থল।
এছাড়া দ্বীপটি সামুদ্রিক মাছের প্রজনন ক্ষেত্র, কাঁকড়া ও ঝিনুকের আবাসস্থল, উপকূলীয় ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের প্রাকৃতিক প্রতিরোধক এবং বিরল সামুদ্রিক কচ্ছপের ডিম পাড়ার উপযোগী পরিবেশ।
ম্যানগ্রোভ বন কীভাবে ধ্বংস হচ্ছে?
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, চিংড়ি চাষের জন্য- ম্যানগ্রোভ গাছ কেটে ফেলা অথবা শিকড়সহ গাছ উপড়ে ফেলা হচ্ছে। বাঁধ নির্মাণ করে জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করা হচ্ছে। খাল ভরাট করে তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম ঘের। লবণাক্ত পানির কৃত্রিম নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রাকৃতিক জলচক্র পরিবর্তন করা হচ্ছে। ফলে কয়েক বছরের মধ্যেই বহু এলাকা বনশূন্য হয়ে পড়েছে।
জীববৈচিত্র্যের ভয়াবহ ক্ষতি
ম্যানগ্রোভ একটি জীবন্ত ইকোসিস্টেম। এখানে বসবাস করে- বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ির প্রাকৃতিক পোনা, সাপ, জলচর পাখি, সরীসৃপ, অগণিত অণুজীব। বন ধ্বংসের ফলে খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে যাচ্ছে। অনেক সামুদ্রিক মাছ তাদের জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে ম্যানগ্রোভে আশ্রয় নেয়। বন ধ্বংসের ফলে মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে।
ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি বাড়ছে
ম্যানগ্রোভ বন প্রাকৃতিক দেয়ালের মতো কাজ করে। এটি ঢেউয়ের শক্তি কমায়, জলোচ্ছ্বাসের গতি কমায় এবং বাতাসের বেগ হ্রাস করে। বন কেটে ফেললে পুরো দ্বীপ ঝুঁকির মুখে পড়ে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বৃদ্ধি
ম্যানগ্রোভ পৃথিবীর অন্যতম কার্যকর Blue Carbon Ecosystem। এই বন প্রচুর কার্বন ধরে রাখে এবং গ্রিনহাউস গ্যাস কমাতে সাহায্য করে। বন ধ্বংস হলে সঞ্চিত কার্বন বায়ুমণ্ডলে ফিরে যায় এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।
ভূমিক্ষয়
ম্যানগ্রোভের শিকড় মাটি আঁকড়ে ধরে। গাছ না থাকলে জোয়ারে মাটি ভেঙে যায় এবং দ্বীপের আয়তন কমতে থাকে। এছাড়া উপকূল ক্ষয় বাড়ে।
পরিবেশকর্মীদের দাবি, ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংসের ফলে শুধু গাছই হারিয়ে যাচ্ছে না, বরং ধ্বংস হচ্ছে পুরো উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র। এই বনের ওপর নির্ভরশীল অসংখ্য মাছ, কাঁকড়া, ঝিনুক, সরীসৃপ ও জলচর প্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি পরিযায়ী পাখির বিচরণও কমে আসছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ম্যানগ্রোভ বন উপকূলকে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাত থেকে রক্ষা করার প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। এই বন ঢেউয়ের শক্তি কমিয়ে উপকূলীয় ভূমিক্ষয় রোধ করে এবং বিপুল পরিমাণ কার্বন শোষণ করে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে বন ধ্বংসের প্রভাব স্থানীয় পরিবেশ ছাড়িয়ে জাতীয় পর্যায়েও পড়তে পারে।
স্থানীয় জেলেরা বলছেন, আগে আশপাশের খাল ও মোহনায় প্রচুর মাছ ও কাঁকড়া পাওয়া যেত। কিন্তু বন কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাছের উৎপাদনও কমে এসেছে। এতে তাদের জীবিকা সংকটের মুখে পড়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, “দিনের পর দিন বন কেটে ঘের বানানো হচ্ছে। বিষয়টি সবাই জানে, কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায় না। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে সোনাদিয়ার প্রাকৃতিক বন আর থাকবে না।”
পরিবেশবিদদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ছাড়াই বনভূমির চরিত্র পরিবর্তন করা হচ্ছে। তারা অবৈধ দখল উচ্ছেদ, বন পুনরুদ্ধার এবং নিয়মিত নজরদারির দাবি জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিংড়ি বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্য হলেও পরিবেশ ধ্বংস করে এই শিল্পের সম্প্রসারণ দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য ক্ষতিকর হবে। টেকসই চিংড়ি চাষ নিশ্চিত করতে পরিবেশ সংবেদনশীল এলাকায় নতুন ঘের নির্মাণ বন্ধ করা এবং বিদ্যমান বন সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
আইন কী বলে?
বাংলাদেশে বনভূমি ধ্বংস, সংরক্ষিত এলাকা দখল বা পরিবেশের ক্ষতি বিভিন্ন আইনের আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে বন সংরক্ষণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বন্যপ্রাণী সুরক্ষা–সংক্রান্ত আইন। যদি সোনাদিয়া দ্বীপের সংরক্ষিত বা পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অনুমতি ছাড়া বন উজাড় করে চিংড়ি ঘের স্থাপন করা হয়ে থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারে।
পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সোনাদিয়া দ্বীপের অবশিষ্ট ম্যানগ্রোভ বনও বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। এর ফলে জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ, উপকূলীয় নিরাপত্তা এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা আরও বড় সংকটের মুখে পড়তে পারে।
সোনাদিয়া দ্বীপ কেবল একটি দ্বীপ নয়; এটি বাংলাদেশের উপকূলীয় পরিবেশের একটি অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ। চিংড়ি চাষ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও, তা যদি ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংস করে পরিচালিত হয়, তবে সেই লাভ সাময়িক হলেও ক্ষতি হবে দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমাত্রিক। তাই উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে কঠোর নজরদারি, আইন প্রয়োগ এবং বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সোনাদিয়ার ম্যানগ্রোভ বন রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।